দোহার ও নবাবগঞ্জে বন্যায় ভেসে গেছে মৎস্য চাষিদের ধন।

দোহার ও নবাবগঞ্জে বন্যায় ভেসে গেছে মৎস্য চাষিদের ধন।

ডেস্ক সংবাদ: গত ১৫দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানির চাপে পদ্মা, ইছামতি ও কালীগঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।এতে প্লাবিত হয়েছে দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম। ফলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে সাধারন মানুষের সাথে ভেসে গেছে এই দুই উপজেলার প্রায় নয়শতটি পুকুরের মাছ ও মাছের পোনা। অবকাঠামোগত ক্ষতিও হয়েছে অনেক পুকুরের। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ শতাধিক মৎস্য চাষি। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। করোনা ভাইরাসের এমন মহামারিতে দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার বন্যার পানিতে পুকুরের মাছ ও রেনু পোনা ভেসে যাওয়ায় এমন ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দোহার ও নবাবগঞ্জের মৎস্যচাষিরা। বন্যায় ভেসে গেছে এসকল মৎস্য চাষিদের স্বপ্ন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোহার উপজেলার রাইপাড়া, কুসুমহাটি, নয়াবাড়ি, মাহমুদপুর, বিলাসপুর, সুতারপাড়া, নারিশা ইউনিয়নে প্রায় পুকুর রয়েছে ৫৪০ টি। এর মধ্যে প্রায় ৪৫০টি পুকুর তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার মাছ ও রেনু পোনা ভেসে গেছে।

অপরদিকে, নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর, বারুয়াখালী, শিকারীপাড়া, যন্ত্রাইলসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় ৪৫০টি পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমান প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

জানা যায়, এই দুই উপজেলার মৎস্য চাষীদের মধ্যে অনেকেই ধার দেনা বা এনজিওদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহন করে পুকুরে মাছ চাষ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক ভাবে বন্যার পানিতে সব তলিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন এই সব মৎস্যচাষীরা।

দোহারের জালালপুর এলাকার মৎস্য চাষী মো.শাহজাহান খান ওরফে সোহেল জানান, এমনিতেই আমার ৪টি পুকুর তলিয়ে গিয়ে পাচঁ লাখ টাকার মাছ ভেসে গিছে।তার উপর দিশেহারা সেখানে আবার এনজিওদের ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য চলছে অনেক চাপ। যেখান সরকার থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কিস্তি আদায়ে চাপ না দেওয়া জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু এনজিও কর্মীরা সরকারের নির্দেশ তোয়াক্কা না করেই আমাদের কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা আছি মহা বিপদে রয়েছি।

দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের জামালচর গ্রামের দিলরুবা মৎস্য খামার ও খান মৎস্য খামারের মালিক ফিরোজ খান ও লিপন খান জানান, আমাদের দুই ভাইয়ের প্রায় ৮টি পুকুর ভেসে গিয়ে অন্তত ১৫ লাখ টাকার মাছ ও রেনু পোনা পানিতে ভেসে গেছে। আর হঠাৎ করে এবার বন্যা হওয়ায় আমাদের এত টাকার মাছ গুলো কোথাও বিক্রি বা অন্য কোন পুকুর স্থানান্তরও করতে পারি নাই। এক রাতের মধ্যে আমাদের সব গুলো পুকুর ভেসে গেছে বন্যার পানিতে।

দোহার উপজেলা যুবলীগের সদস্য ও মৎস্য খামারী মোঃ শাহীন জানান, হঠাৎ করে বন্যার পানি এসে আমার তিনটি পুকুরে প্রায় ৫ লাখ টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। মৎস্যচাষী নরেন রাজবংশী জানান, এবার হঠাৎ করে বন্যার পানি বেড়ে গিয়ে আমার সব গুলো পুকুর তলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ও রেনু পোনা ভেসে গেছে। একই উপজেলার মৎস্য চাষী ফজলু শেখ প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে জানান।

উপজেলা বানাঘাটা গ্রামের মৎস্য খামারী মো. মাসুম জানান, পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করায় আমার প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। আমি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদেরকে অবগত করেছি। যদি সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা না করেন তাহলে আমরা আর ঘুরে দাড়াঁতে পাড়বো না। আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।

নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাওয়ালিয়া গ্রামের মৎস্য চাষি নিপু ট্রেডার্সের মালিক অনুপম দও নিপু জানান, প্রায় ১২ একর জমিতে পুকুর খনন করে তিনি মাছের চাষ করেছে। বন্যার পানিতে আমার পুকুর তলিয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। পানি বাড়লে ক্ষতির পরিমান দাড়াবে ২০ লাখ।

এছাড়াও দোহার ও নবাবগঞ্জের এই দুই উপজেলার আরও অনন্ত ৯শ পুকুর তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

দোহার ও নবাবগঞ্জের মৎস্য চাষীদের এমন দুর্ভোগে সরকারের পক্ষ থেকে যাতে কিছুটা সাহায্য সহযোগিতা পায় সেই দাবি করেছেন স্থানীয় দোহার ও নবাবগঞ্জের মৎস্য চাষী ও ব্যবসায়ীরা।

দোহার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোসাম্মৎ লুৎফর নাহার জানান, দোহার উপজেলায় প্রায় সাতশতটি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০টি পুকুর তলিয়ে মাছ ও রেনু পোনা ভেসে যাওয়ায় মৎস চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্য চাষিদের নাম ও ক্ষতির পরিমান তালিকা করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের তালিকা প্রেরন করবো ।

অপরদিকে, নবাবগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রিয়াংকা সাহা জানান, নবাবগঞ্জ উপজেলায় অনন্ত ১২০০ পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬০টি পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে কয়েক কোটি টাকার মাছ ও রেনু পোনা ভেসে গেছে। আমরা আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্যচাষিদের সার্বিকভাবে সহযোগিতার ব্যবস্থা করবো।

দোহার,ঢাকা।

অর্থনীতি